বিএম সজিব স্টাফ রিপোর্টার
সৌর ইন্ডাকশন চুলা ও ডিজিটাল কার্বন ক্রেডিটের ধারণায় ৪৮ দলকে পেছনে ফেলল সিএসই শিক্ষার্থীদের দল CarboSync; দ্বিতীয় Team Innovators, তৃতীয় Food Mind
নিজস্ব প্রতিবেদক, শরীয়তপুর:
জেড এইচ শিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ZHSUST) অনুষ্ঠিত ‘Business Idea Competition-2026’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের দল CarboSync।
সৌরশক্তিচালিত ইন্ডাকশন চুলা ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাইকৃত কার্বন ক্রেডিটের সমন্বয়ে গ্রামীণ রান্নাঘরকে ধোঁয়ামুক্ত করার উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করে বিচারকদের নজর কাড়ে দলটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ZHSUST Business Club আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন বিভাগের ২৮টি দল অংশ নেয়। প্রাথমিক বাছাই শেষে ১০টি দল চূড়ান্ত পর্বে তাদের ব্যবসায়িক ধারণা, পরিকল্পনা, সম্ভাব্য বাজার, বাস্তবায়নযোগ্যতা ও উদ্ভাবনী দিক তুলে ধরে। মূল্যায়ন শেষে CarboSync প্রথম, Team Innovators দ্বিতীয় এবং Food Mind তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
CarboSync-এর উদ্ভাবনী ধারণা
CarboSync-এর সদস্যরা জানান, দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার এখনো কাঠসহ বিভিন্ন কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করে রান্না করে। এতে রান্নার সময় সৃষ্ট ধোঁয়ায় নারী ও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। পাশাপাশি জ্বালানি সংগ্রহেও পরিবারের সদস্যদের উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়।
এ সমস্যা সমাধানে CarboSync একটি সৌরচালিত ইন্ডাকশন চুলা তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে। এতে থাকবে ৩০০ ওয়াটের সোলার প্যানেল, ১.২৮ কিলোওয়াট-ঘণ্টার LiFePO4 ব্যাটারি এবং ১,০০০ ওয়াটের ইন্ডাকশন কুকটপ। দিনে সৌরশক্তি, রাতে ব্যাটারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রিড বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চুলাটি চালানো যাবে।
চুলাটিতে একটি IoT মিটার যুক্ত থাকবে, যা রান্নার সময় বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য ক্লাউডে পাঠাবে। এই তথ্যের মাধ্যমে কতটা কাঠ পোড়ানো বন্ধ হয়েছে এবং কত পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হয়েছে, তা ডিজিটালভাবে পরিমাপ ও যাচাই করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যাচাই করে এসব কার্বন সাশ্রয়কে কার্বন ক্রেডিটে রূপান্তর করে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও এয়ারলাইনসের মতো ক্রেতাদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করছে দলটি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, একটি পরিবার চুলাটি ব্যবহার করলে বছরে প্রায় ১.১৭ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
কার্বন ক্রেডিট থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ ব্যবহার করে চুলার দাম ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী ৮ হাজার, ১৫ হাজার ও ২২ হাজার টাকা—এই তিনটি মূল্যে চুলাটি সরবরাহের পরিকল্পনা করেছে দলটি। পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিস্তিতে চুলা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
প্রথম ধাপে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে ১০০টি চুলা নিয়ে পাইলট প্রকল্প চালুর লক্ষ্য রয়েছে CarboSync-এর। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন বলে জানিয়েছে দলটি। বর্তমানে IoT মিটারের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বিজয়ী দলের সদস্যরা
CarboSync দলের তিন সদস্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী।
* মোঃ শরীফ আলম — সিইও ও টেকনিক্যাল লিড। তিনি চুলার হার্ডওয়্যার ও IoT প্রযুক্তির দায়িত্বে রয়েছেন।
* গাজী রশিদ উদ্দিন উপল — সিওও। তিনি পাইলট প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম দেখবেন।
* মুসফিকা ইকফাত — সিএমও। তিনি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানো ও প্রচারের দায়িত্বে রয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দিন। সভাপতিত্ব করেন ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান মোঃ মহিউদ্দিন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মেধা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা কাজে লাগিয়ে নিজেদের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।”
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজিদ হাসান রুকু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন একই বিভাগের প্রভাষক তানভীর আহমেদ। প্রেজেন্টেশন পর্বে মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন প্রভাষক আব্দুর রহিম।
পরে অতিথিরা বিজয়ী দলগুলোর সদস্যদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। আয়োজকরা জানান, শিক্ষার্থীদের ব্যবসায়িক চিন্তা, নেতৃত্বের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়াতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।