এলজি, রিভলভার ও পিস্তল উদ্ধার; হত্যাকাণ্ডের ২৪ ছয় ঘণ্টার মধ্যে পুলিশের অভিযান
চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ এম আর তাওহীদ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে যুবদল কর্মী তারেক হোসেন বাপ্পি (২৬) হত্যা ও তাপসির আলম শাওনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় প্রধান আসামি মো. আরিফ হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি করা একটি এলজি, একটি রিভলভার ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, গত ১৬ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে সীতাকুণ্ড মডেল থানাধীন বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের অলিনগর তিন রাস্তার মোড়সংলগ্ন পাকা সড়কে যুবদল নেতা সাদ্দামের পুরোনো কার্যালয়ের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, রাতে খাবার খেয়ে তারেক হোসেন বাপ্পি তাঁর বন্ধু ইমনকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে সাদ্দামের বাড়িসংলগ্ন কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন। এর আগে থেকেই আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে অবস্থান করছিলেন প্রধান অভিযুক্ত আরিফ হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁরা বাপ্পি ও তাঁর বন্ধুর মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে দুজনকে নামিয়ে মারধর করেন।
একপর্যায়ে হামলাকারীদের একজন বাপ্পিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিটি তাঁর গলায় লাগে। এ সময় অন্য অভিযুক্তরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। বাপ্পির সঙ্গে থাকা ইমনও গুলিবিদ্ধ হন বলে জানা গেছে। তবে তিনি কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। পরে বাপ্পি ও শাওন গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকেন। হামলাকারীরা তাঁদের ওপর আরও হামলা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, স্থানীয় যুবদল নেতা মো. সাদ্দাম ও নিহত বাপ্পির সঙ্গে প্রধান অভিযুক্ত আরিফ হোসেন এবং তাঁর সহযোগীদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং সাগর থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সূত্রপাত বলে ধারণা করছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিরোধের জেরে বাপ্পিকে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পথে বাধা মনে করতেন অভিযুক্তরা। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আগে থেকে ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে বাপ্পির ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় শাওনও হামলার শিকার হন।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ছয়
হত্যাকাণ্ডের পরপরই জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। ঘটনাস্থলের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামি আরিফ হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি করা তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন
১. মো. আরিফ হোসেন (২৯): পিতা ইসমাইল হোসেন প্রকাশ বিকষু, মধ্যম মাহমুদাবাদ, দীঘির নালা, ফকির আহম্মদের নতুন বাড়ি, বাড়বকুণ্ড।
২. ফখরুল ইসলাম (৩২): পিতা মৃত নুর আলম, অলিনগর, চৌকিদার বাড়ি, বাড়বকুণ্ড।
৩. আব্দুল মান্নান (২৮): পিতা আবুল কাশেম, নডালিয়া, বাড়বকুণ্ড।
৪. মো. ইফতেখার (৩৫): পিতা মো. মোজ্জামেল হক, অলিনগর, নতুন বদু বাড়ি, বাড়বকুণ্ড।
৫. আরিফুল ইসলাম জাবেদ (২৫): পিতা মো. নজরুল ইসলাম, হাসনাবাদ, জিয়াজি হুজুরের বাড়ি, মুরাদপুর।
৬. নুর আহাম্মদ রনি: পিতা মৃত জহির ইসলাম, মধ্যম মাহমুদাবাদ, দীঘির নালা, বাড়বকুণ্ড, সীতাকুণ্ড।
গ্রেপ্তার নিয়ে এলাকাবাসীর ভিন্ন দাবি
এদিকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন ইফতেখারকে নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর কয়েকজনের দাবি, ঘটনার দিন ইফতেখার তাঁদের বাড়িতে তাঁর বোনের মেহেদি অনুষ্ঠানে ছিলেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরদিন সকালে পুলিশ তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে যায়। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন।
অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় সাগর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। তাঁদের মতে, অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাদক ব্যবসা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ ধরনের সংঘর্ষ, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঝুঁকি কমতে পারে।
এলাকাবাসী অবৈধ বালু উত্তোলন, মাদক ব্যবসা এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন।
তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, প্রত্যেক গ্রেপ্তার ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা এবং অস্ত্রগুলোর ব্যবহার তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।