ভোলার বিভিন্ন উপজেলায় জেলেদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ভিজিএফের চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার ৪০ দিন পেরিয়ে গেলেও অনেক জেলে এখনো চাল পাননি। এর জেরে চরফ্যাশনে এক ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং লালমোহনে বিক্ষুব্ধ জেলেরা রাস্তায় নেমেছেন।
চরফ্যাশন উপজেলার চর মানিকা ইউনিয়নে জেলেদের চালের তালিকা প্রণয়নকে কেন্দ্র করে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে ইউপি কার্যালয়ে তালিকা চূড়ান্ত করার জন্য একটি বৈঠক বসে।
বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনারা বেগম, তাঁর স্বামী আবুল কালাম ফরাজী, ইউপি সচিব মো. ইয়ামিন এবং দক্ষিণ আইচা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু তাহেরসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ ওঠে, বিএনপি নেতারা প্রকৃত জেলেদের পরিবর্তে তাদের দলীয় কর্মীদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।
চেয়ারম্যান মিনারা বেগম এই অনিয়ম মানতে অস্বীকৃতি জানান এবং তালিকাটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অনুমোদনের জন্য পাঠানোর কথা বলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বিএনপি নেতারা বৈঠক ছেড়ে চলে যান। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান ও তাঁর স্বামী কার্যালয় থেকে বের হলে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা তাদের পিটিয়ে আহত করার পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন ভাঙচুর করে। খবর পেয়ে দক্ষিণ আইচা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।
বরাদ্দের অনিয়ম: ওই ইউনিয়নে ১২০০ জেলের জন্য চার মাসের (মার্চ-জুন) মোট ১৯২ টন চাল বরাদ্দ আসে। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক জেলের চার মাসে ১৬০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও, বেআইনিভাবে এই চাল দ্বিগুণেরও বেশি (প্রায় ২৪০০) জেলের মধ্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
আহত চেয়ারম্যানের বক্তব্য: হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মিনারা বেগম জানান, প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে দলীয় লোকদের তালিকায় ঢোকানোর প্রতিবাদ করায় বিএনপি নেতারা তাদের ওপর এই হামলা চালিয়েছে। তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
ইউপি সচিবের বক্তব্য: ইউপি সচিব মো. ইয়ামিন জানান, দলীয় নেতাদের হস্তক্ষেপ ও বাধার কারণেই চাল বিতরণে দেরি হচ্ছে।
বিএনপি নেতার বক্তব্য: হামলার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা মো. আবু তাহের। তাঁর দাবি, তারা প্রকৃত জেলেদের নামই তালিকায় দিয়েছেন। ইউপি চেয়ারম্যান ও তাঁর স্বামী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাল বিতরণে দেরি করছেন, যার ফলে ক্ষুব্ধ সাধারণ জেলেরাই এই হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, চাল না পেয়ে চরম ক্ষোভে ফুঁসছেন লালমোহন উপজেলার জেলেরাও। শুক্রবার বিকেলে ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের কোবখালী মাছঘাটে শতাধিক জেলে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন।
তাঁদের অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান চাল বিতরণে ইচ্ছাকৃতভাবে টালবাহানা করছেন এবং উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। তবে চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমানের দাবি, তালিকা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণেই এই বিলম্ব। তালিকা চূড়ান্ত হলেই দ্রুত চাল দেওয়া হবে।
লালমোহন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলী আহমেদ আখন্দ জানান, ঈদের আগেই চাল বিতরণের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ইউপি পর্যায়ের ঝামেলার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে ভোলার জেলা প্রশাসক মো. শামীম রহমান এবং সংশ্লিষ্ট ইউএনওরা জানিয়েছেন, তালিকা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা দ্রুত নিরসন করে প্রকৃত জেলেদের হাতে চাল তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।