রাজধানীর শনিরআখড়া ও দনিয়া কলেজ সংলগ্ন এলাকায় এখন এক আতঙ্কের নাম ‘কিং মাহফুজ’ গ্রুপ। প্রকাশ্য দিবালোকে দনিয়া কলেজের অনার্স ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজুলকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত আসামিরা গ্রেফতার হলেও, বর্তমানে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে তারা এখন মুক্ত। এতে বিচার পাওয়া নিয়ে চরম শঙ্কায় রয়েছে নিহতের পরিবার।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি দনিয়া কলেজের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিনহাজুলের সঙ্গে মাহফুজ ওরফে কিং মাহফুজের বাকবিতণ্ডা হয়। এর দুই দিন পর, ২৮ জানুয়ারি বিকেলে মিনহাজ ও তার বন্ধু আহাদ কলেজের সামনে গেলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সুইচ গিয়ার, চাকু ও চাপাতি নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘাতক দল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মিনহাজুলের মৃত্যু হয়।
মামলার বর্তমান অবস্থা: বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে
ঘটনার পর মিনহাজুলের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে মূল হোতা কিং মাহফুজসহ ৫ জনকে পটুয়াখালী থেকে গ্রেফতারও করেছিল। কিন্তু বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত।
তদন্তে উঠে আসা মূল আসামিরা:
কিং মাহফুজ (মাহফুজ সরকার): হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও ১নং আসামি।
জাহিদুল ভুঁইয়া শাওন: এজাহারভুক্ত ২নং আসামি।
সহযোগী: সাব্বির সরকার, আশিক ও সোহান মিয়া।
পরিবারকে হত্যার হুমকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে এই মামলার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জামিনে বের হওয়ার পর আসামিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মামলার বিচার চাইতে গেলে বা সাক্ষ্য দিলে মিনহাজুলের স্ত্রী, মা এবং বাবা—সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে আসামিরা। সন্তান হারানোর শোকে কাতর পরিবারটি এখন জীবননাশের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আসামিরা বর্তমানে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে ও রাজনৈতিক পাওয়ার দেখিয়ে মিনহাজুলের পরিবারকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা এলাকায় প্রচার করছে যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না।
এখন জনমনে প্রশ্ন একটাই— বিএনপি কি এই ধরণের চিহ্নিত হত্যাকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের ‘শেল্টার’ দিচ্ছে? নাকি একটি অসাধু চক্র দলের নাম ভাঙিয়ে এই অপকর্ম করছে? অথবা প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কেউ কি এই খুনিদের মদদ দিচ্ছে?
এলাকা এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য
এলাকাবাসীর দাবি, আসামিরা জামিনে বের হওয়ার পর থেকে শনিরআখড়া ও দনিয়া কলেজ এলাকায় পুনরায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং কালচার সক্রিয় করে তুলেছে। খুনিরা প্রভাবশালী মহলের তথাকথিত ‘শেল্টার’ ব্যবহার করে প্রকাশ্য দিবালোকে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের হাহাকার
মিনহাজুলের মা ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার কলিজার টুকরাকে ওরা কুপিয়ে মারল, আর এখন আমাদেরকেও মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমরা কি বিচার পাব না?” প্রশাসনের নাকের ডগায় খুনিরা ঘুরে বেড়ালেও তাদের পুনরায় গ্রেফতার বা দ্রুত বিচারের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।
দাবি ও প্রত্যাশা
১. মিনহাজ হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা।
২. আসামিদের জামিন অবিলম্বে বাতিল করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা।
৩. রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পার পাওয়ার পথ বন্ধ করা এবং এলাকাকে গ্যাং মুক্ত করা।
উপসংহার:
একটি মেধাবী স্বপ্নকে চাপাতি দিয়ে পিষে ফেলার পর অপরাধীরা যদি টাকার জোরে বা রাজনৈতিক প্রভাবে মুক্ত থাকে, তবে তা বিচার ব্যবস্থার জন্য চরম লজ্জাজনক। মিনহাজুলের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যথায়, এই অসাধু চক্রের হাতে আরও অনেক প্রাণ ঝরে যাবে।