সেপটিক ট্যাংকে নিভে যাওয়া তায়েবা: বছর পেরোলেও কেন অধরা নেপথ্যের গডফাদাররা?
— অপরাধের শেষ পাতা (বিশেষ অনুসন্ধান সেল)
শরীয়তপুর, সখিপুর:
একটি ছয় বছরের নিষ্পাপ শিশু। যার কেবলই বর্ণমালার সাথে পরিচয় ঘটছিল স্থানীয় মাদ্রাসার নার্সারির ক্লাসে। নাম তার তায়েবা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের সেই অভিশপ্ত বিকেলে যে শিশুটি হাসিমুখে খেলতে বেরিয়েছিল, কে জানতো মাত্র দুই দিন পর তার অর্ধগলিত ক্ষতবিক্ষত মরদেহ মিলবে প্রতিবেশীর অন্ধকার সেপটিক ট্যাংকের ভেতর?
তায়েবার নিথর দেহের সাথে সাথে সেদিন সখিপুরের ছৈয়ালকান্দি গ্রামের মানুষের মানবিকতাও যেন ওই অন্ধকার কূপেই নিমজ্জিত হয়েছিল। ঘটনার পর কেটে গেছে বেশ কিছু সময়। পুলিশ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, কান থেকে ছিনিয়ে নেওয়া স্বর্ণের দুল গলানো অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে, এমনকি ঘাতক নাসিমা ও আসিফ বেপারী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
কাগজে-কলমে মামলার অগ্রগতি এটুকুই। কিন্তু "অপরাধের শেষ পাতা"র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক গা শিউরে ওঠা নেপথ্য কাহিনী, যা আজ পর্যন্ত কোনো মূলধারার টিভি চ্যানেল বা বড় পত্রিকা প্রকাশ করার সাহস পায়নি।
পর্দার আড়ালে কারা? ঝুলন্ত মামলার নেপথ্য খলনায়ক
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ের খুনিদের গ্রেপ্তার করেই কি তাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলেছে? তায়েবা হত্যার মূল মাস্টারমাইন্ড এবং পরিকল্পনাকারীরা কি তবে অধরাই থেকে যাবে?
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু পারিবারিক পৈতৃক জমির বিরোধই ছিল না, ছিল এক গভীর ও পরিকল্পিত নীলনকশা। মামলার প্রধান অভিযুক্ত, তায়েবার আপন চাচি ও স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আয়েশা খাতুনকে বাঁচানোর জন্য পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে এক শক্তিশালী অসাধু চক্র।
হত্যাকারীদের 'বড় ভাই' ও রাজনৈতিক ঢাল:
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বাঁচানোর জন্য মাঠে নেমেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের 'বড় ভাইরা'। এই খুনিদের রক্ষাকর্তা হিসেবে যারা কাজ করছে, তারা এলাকায় চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা ও নানা অপকর্মের সাথে জড়িত। মামলাটিকে ভিন্ন খাতে মোড় ঘুরাতে এবং চার্জশিট থেকে মূল প্রভাবশালীদের নাম বাদ দিতে এই অসাধু চক্রটি দিনরাত তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে সব তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও মামলাটি আজও চূড়ান্ত রায়ের আলো দেখেনি, পড়ে রয়েছে ঝুলন্ত অবস্থায়।
এমপি-মন্ত্রীর দরবারে লবিং: ধামাচাপা দেওয়ার মহাসূত্র
তায়েবা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যত গভীরে যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে রাঘববোয়ালদের নাম। অভিযোগ উঠেছে, মামলার প্রধান আসামিদের খালাস করতে কিংবা লঘু শাস্তির ব্যবস্থা করতে এই অঞ্চলের বড় বড় এমপি ও মন্ত্রীদের রাজনৈতিক দরবারে দেদারসে লবিং ও অর্থ লেনদেনের চেষ্টা চলছে।
আইনি প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ক্ষমতার চাদরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে স্রেফ একটি "সাধারণ দুর্ঘটনা" বা "পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে এক শ্রেণীর অসাধু রাজনৈতিক নেতা। মন্ত্রিপাড়ার বড় বড় নেতার নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে চাপ সৃষ্টি করার গুঞ্জনও এখন সখিপুরের বাতাসে ভাসছে। প্রশ্ন উঠেছে—একটি ৬ বছরের এতিম শিশুর রক্তের চেয়েও কি রাজনীতির চেয়ার আর কালো টাকার জোর বেশি শক্তিশালী?
বিচারের বাণী নীরবে কাঁদে: হুমকির মুখে বাদীপক্ষ
একদিকে যখন ক্ষমতার অলিন্দে মামলা ধামাচাপা দেওয়ার উৎসব চলছে, অন্যদিকে তখন তায়েবার হতভাগ্য বাবা টিটু সরদার ও মা ডলি আক্তার প্রতিটা মুহূর্ত কাটাচ্ছেন মৃত্যুর আতঙ্কে।
মামলা তুলে নেওয়ার জন্য খুনিদের সহযোগীরা প্রতিনিয়ত তাদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ডলি আক্তারের আর্তনাদ, "আমার কোল খালি করেছে যারা, তারা এখন আমার একমাত্র ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।" আসামিপক্ষের এই ক্রমাগত হুমকির মুখে তায়েবার ছোট ভাইয়ের স্কুলে যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। যে পরিবারটি সন্তান হারিয়েছে, আজ রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, অথচ খুনিদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সমাজের তথাকথিত 'বড় ভাই' ও ভিআইপি লবিস্টরা।
আমাদের চোখ থাকবে শেষ পর্যন্ত
তায়েবা হত্যার বিচার কি তবে রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে? 'বড় ভাই' আর 'এমপি-মন্ত্রীদের' রাজনৈতিক প্রভাব কি তবে আইনের চেয়েও বড়?
সখিপুরের সচেতন সমাজ ও দেশের বিবেকবান মানুষ আজ এই ধামাচাপার রাজনীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে। ছৈয়ালকান্দি গ্রামের সেপটিক ট্যাংকের সেই অন্ধকার থেকে তায়েবার আত্মা আজো বিচার চাইছে। "অপরাধের শেষ পাতা"র স্পষ্ট ঘোষণা—যতক্ষণ না এই মামলার নেপথ্যের গডফাদার ও অসাধু চক্রের মুখোশ উন্মোচিত হচ্ছে এবং খুনিদের ফাঁসির দড়ি কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ আমাদের কলম থামবে না। ক্ষমতার দাপটে সত্যকে চাপা দেওয়া যাবে না।
(কপিরাইট: অপরাধের শেষ পাতা — সত্যের সন্ধানে নির্ভীক)